বাঙালি কেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা
দেয়ালঘড়িতে তখন সময় রাত তিনটা ছুঁইছুঁই। আর্জেন্টিনা-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ যখন শেষ হলো। আর্জেন্টিনার জয় ২-১ গোলে। মাঠে মেসির দল আনন্দ করছে। চলছে কোলাকুলি। উৎসব যে তখন এখানেও।
চারতলা বন্ধ রুমের ভেতর থেকে ঠিকই টের পাওয়া গেল রাস্তায় মিছিল হচ্ছে। আর্জেন্টিনার পতাকা হাতে নিয়ে চলছে দৌড়াদৌড়ি। মেসি-মেসি চিৎকারের স্লোগান শুনে আশপাশের ফ্ল্যাট থেকে অনেকে চোখ কচলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।
আর্জেন্টিনার জয়োৎসবের একটুকরো ছবি এটি।
সোমবার দুপুরে কাজ সেরে ফার্মগেটে এসে মিরপুরের এসি বাসের লাইনে দাঁড়ালাম। আনন্দ সিনেমা হলের পাশের ফুটপাথে বিশ্বকাপের পতাকা বিক্রি করছিলেন সুলেমান। বেশ হাসিমুখ আজ তার।
-কোন দেশের পতাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে?
আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা। আর জার্সি বেশি মেসির।
বোঝাই গেল রাতে আর্জেন্টিনার জয় সুলেমানের পতাকা ও জার্সি বিক্রির বাণিজ্যেও ভালো প্রভাব রেখেছে।
এই দেশের মানুষ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ফুটবলকে এত ভালোবাসে অথচ ওই দুটি দেশ যে মানচিত্রে বাংলাদেশের বিপরীত প্রান্তে। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ জুড়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায় বাড়ির ছাদ ছেয়ে যায়। অন্য গোলার্ধের এই দুটি দেশের ফুটবলের সঙ্গে বাঙালির এমন প্রেমের সম্পর্কের কারণ কী?
আমরাও সেই প্রশ্নের কিছু উত্তর খুঁজি এখানে।
মানুষ সাফল্যের পূজারি। আর বিষয় যখন বিশ্বকাপ ফুটবল তখন এই বৈশ্বিক আসরের অতীত সাফল্যের অনেক বড় অংশ জুড়ে আছে ব্রাজিল। তা ছাড়া আমাদের পাঠ্যপুস্তকেও ‘ব্রাজিলের কালো মানিক পেলে’—এমন একটা গল্প ছিল। তাই বাংলাদেশের বাঙালি শৈশব থেকেই বিশ্বকাপ ফুটবল বলতে ব্রাজিলের প্রতিই তার সমর্থন দিয়ে আসছে। যে ব্রাজিলের তারকাদের কথা শুনে এবং পড়ে তাদের সমর্থন দিয়েছে তাদের অনেককে মাঠে এই বাঙালি খেলতেই দেখেনি। শুধু গল্প পড়েছে। বারকয়েক টিভিপর্দায় কিছু ঝলক দেখেছে। কিন্তু তারপরও তাদের সাফল্যের সঙ্গী হয়েছে। লাতিন ফুটবলের সৌন্দর্য, ছন্দ এবং আক্রমণাত্মক খেলার ছকে বাঙালি নিজেকে আবিষ্কার করে। তাই দূরদেশের অচেনা পেলে, গারিঞ্চা, ভাভা, দিদি, মারিও জাগালো, নিল্টন সান্তোষ, আলতাফিনি, জিটো, সক্রেটিস, জিকো, জুনিয়র, ফালকাও, সার্জিনহো—এই নামগুলোকে বাঙালি ‘নিজের মানুষ’ ভাবতে পছন্দ করে। ব্রাজিলের প্রতি এই সমর্থন আরও জোরালো হয় রোনালদো, রোমারিও, বেবেতো, রোনালদিনহোর ফুটবল জাদু এবং সাফল্যের সমাহারে। ব্রাজিলের বস্তিবাসীদের দারিদ্র্যের কষ্টপীড়িত জীবনযাপনের বাস্তবতার সঙ্গে বাঙালি নিজের পরিচালিত জীবন নির্বাহের একধরনের মিলও খুঁজে নেয়। তাই ব্রাজিলের ফুটবল এবং ফুটবলারদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়। জানিয়ে দেয়, আমি-তুমি এক দলের এক ছাদের মানুষ!
ব্রাজিলের খেলার ধরনের সঙ্গে আর্জেন্টিনার তেমন বড় পার্থক্য নেই। তবে প্রতিবেশী দুদেশের মধ্যে তেমন ফুটবল নিয়ে সুসম্পর্ক নেই। ক্লাসের ফার্স্টবয় এবং সেকেন্ড বয়ের মতো স্বভাবসুলভ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই দুদেশের ফুটবলের মধ্যে। বাঙালিও তেমনই এই দুদলের সমর্থনকে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। আর এই সমর্থনের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় আগুন জ্বালিয়েছেন একজন আর্জেন্টাইন—ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। এই লোকটি তার ফুটবল ক্যারিশমা দিয়ে এত আনন্দ দিয়েছেন যে তাকে একসময় মনে হয়েছে, আরে এ যে আমার ঘরের মানুষ। আর তাই বাঙালি ম্যারাডোনার সাফল্যে আনন্দে হেসেছে। আবার তিনি যখন কেঁদেছেন তার অশ্রুকেও বাঙালি নিজের কান্না মনে করেছে। সারা জীবন প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী তার অবস্থান। আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং নেতৃত্বের চেয়ারে গেঁড়ে বসাদের চিরায়ত সামাজিক ও গোষ্ঠীবাদী অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন ম্যারাডোনা। মাঠে এবং মাঠের বাইরে তার এই লড়াকু যুদ্ধজয়ী মনোভাবকে বাঙালি বুক ভরে ভালোবেসেছে। এবং মূলত এই ম্যারাডোনার জন্যই বাঙালি আর্জেন্টিনার ফুটবলকেও চিনেছে, ভালোবেসেছে। মাঠে ম্যারাডোনার সেই ফুটবল সৌন্দর্য ও জাদুকরী প্রতিভাকে এখন বয়ে নিয়ে চলেছেন লিওনেল মেসি।
মূলত লড়াকু, জেদি, প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাবের ম্যারাডোনা এবং মাঠে বল পায়ে মানুষকে সম্মোহিত করে রাখা মেসির প্রভাবী ফুটবল—এই দুই বিন্দু একত্রিত হয়ে অনেকদূরের আর্জেন্টিনাও আজ বাঙালির কাছে নিজ বাড়ির আঙিনার মতোই!
.png)
কোন মন্তব্য নেই